Categories
নিবন্ধ মঞ্চ

গবেষণাগার নাট্যরীতি এবং স্বপ্নদলের নাট্যসৃজন

বিশ্বনাট্যধারায় সুপরিচিত শব্দ ‘ল্যাবেরেটরি থিয়েটার’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘গবেষণাগার নাট্য’ অভিধাটি বাংলা ভাষায় প্রথম ব্যবহার করেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন, তার গবেষণাগ্রন্থ ‘গবেষণাগার নাট্য : একটি মারমা রূপকথা’-য়। তবে ‘গবেষণাগার নাট্য’ (ল্যাবরেটরি থিয়েটার) এবং প্রচলিত ধারণার ‘গবেষণা নাট্য’ (রিসার্চ থিয়েটার) বা ‘নাট্য গবেষণা’ (থিয়েটার রিসার্চ) প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে দার্শনিক, উপাদানগত, মাত্রাগত ও নৈয়ায়িক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

গবেষণাগার নাট্যের আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ নবতর তত্ত্ব ও প্রয়োগরীতির ভাবনা এবং বিশেষ ঐ শিল্পাদর্শের ভিত্তিতে মঞ্চকেন্দ্রিক নাট্যগবেষণা। অর্থাৎ গবেষণাগার নাট্যের বাধ্যতামূলক স্তর হচ্ছে ল্যাবরেটরি বা ব্যবহারিক পরীক্ষার-নিরীক্ষার পর্যায় এবং এ ধারাবাহিকতায় বর্জন-বিশ্লেষণ-গ্রহণের অধ্যায় পেরিয়ে গবেষণালব্ধ ও চূড়ান্তভাবে বাছাইকৃত সিদ্ধান্তসমূহের মঞ্চে ব্যবহারিকভাবে প্রয়োগ। অন্যদিকে, ‘গবেষণা নাট্য’-র জন্য নবতর তত্ত্ব ও প্রয়োগরীতির ভাবনা সর্বোপরি ল্যাবরেটরি ধাপ জরুরি নয় বরং এর বিস্তৃতি সাধারণত পাণ্ডুলিপি কিংবা প্রচলিত প্রয়োগচিন্তার মধ্যেই থাকে সীমাবদ্ধ।

জ্ঞাত ইতিহাসের প্রামাণ্যসহ প্রথম নাট্যনির্দেশক মিশরীয় ‘এবিডস বা ওসেরিস প্যাশানে প্লে’-র অন্যতম নির্মাতা আই-খার-নেফার্ত (রাজা তৃতীয় উজাটসসেন সম্ভাব্য ১৮৮৭ থেকে ১৮৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ওসিরিসের মন্দির স্থাপন ও প্যাশান প্লে মঞ্চায়নের জন্যে যাকে এবিডসে প্রেরণ করেছিলেন) থেকে শুরু করে প্রথম-আধুনিক নাট্যনির্দেশক বলে স্বীকৃত জার্মানির ২য় জর্জ, ডিউক অব সাক্সেমাইনিনেজেন (১৮২৬-১৯১৪) কিংবা তৎপরবর্তীকালের সচেতন নির্দেশকদের সৃজনের অভ্যন্তরে গবেষণার কিছু উপাদান লক্ষিত হলেও নির্দেশক-নির্বিশেষের কর্মপ্রয়াসকেই ‘গবেষণাগার নাট্য’ হিসেবে সম্মানপ্রদান করা যায় না।

তথাপি ‘ল্যাবরেটরি থিয়েটার’ বা ‘গবেষণাগার নাট্য’-র রয়েছে রয়েছে দীর্ঘদিবসের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। ১৮৯৮-এ পদ্ধতিগত নাট্যগবেষণার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট মস্কো আর্ট থিয়েটারে ‘সাইকোটেকনিক’ বা ‘মেথড’ অভিনয়ের প্রবক্তা কনস্তান্তিন সার্গেইভিচ স্তানিস্লাভস্কি (১৮৬৩-১৯৩৮) ও ভ্লাদিমির নেমিরোভিচ-দেনচেঙ্কো (১৮৫৮-১৯৪৩) আধুনিককালে প্রথম বিশেষ শিল্পাদর্শের ভিত্তিতে মঞ্চকেন্দ্রিক নাট্যগবেষণার সূত্রপাত করেন। স্তানিস্লাভস্কির আত্মজৈবনিক নানাগ্রন্থের মাধ্যমে এ গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিস্তৃত বিবরণ প্রামাণ্যরূপে আমাদের সম্মুখে হাজির হয়েছে। অভিনেতার শারীরিক-আত্মিক নির্মাণ, নির্দেশকের নিয়ন্ত্রণ, শিল্পাদর্শ, চরিত্রের অন্তরঙ্গ ব্যাখা ও বহিরঙ্গ ব্যবহারের অনুধাবন, নাট্য নির্বাচন, পাঠের বাহিরঙ্গ নির্মাণ ও উপপাঠ বিশ্লেষণ প্রভৃতি সর্বক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ব্যবহারিক মঞ্চকেন্দ্রিক নাট্যগবেষণায় ব্যাপৃত ছিলো এ গবেষণাগার।

ব্রিটিশ অভিনেতা-নির্দেশক-মঞ্চ পরিকল্পক গর্ডন ক্রেইগ-ও (১৮৭২-১৯৬৬) সে সময়ে নিজস্ব উদ্যোগে লন্ডনে নাট্যগবেষণায় ব্রতী হন। তার শিল্পাদর্শ ছিলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা বিশিষ্টতার সমন্বয়ে নব্যকালের নাট্যাবয়ব তথা আন্তর্জাতিক থিয়েটারের ভাষা নির্মাণ।

১৯০৫-এ পুনরায় স্তানিস্লাভস্কি ও ভসেভোল্ড মেয়ারহোল্ড (১৮৭৪-১৯৪০) আরেক নাট্যগবেষণাগার ‘থিয়েটার স্টুডিও’ গড়ে তোলেন। এখানেই স্বভাববাদী-প্রকৃতিবাদী বাস্তবতার বিপরীতে মেয়ারহোল্ডের নব্য-শিল্পাদর্শ অর্থাৎ শরীরনির্ভর অভিনয়রীতি ‘বায়োমেকানিকস’ এবং প্রযোজনারীতি ‘কনস্ট্রাকটিভিজম’-এর উদ্ভব ঘটে।

১৯১৩-এ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার অভিপ্রায়ে মেয়ারহোল্ড নিজেই একটি স্থায়ী স্টুডিও গড়ে তোলেন।

Image may contain: 2 people, including Zahid Repon, shoes

‘পুওর থিয়েটার’ বা ‘নিরাভরণ নাট্য’-র প্রবক্তা পোলিশ নাট্যনির্দেশক জার্জি গ্রোটওস্কি (১৯৩৩-১৯৯৯) তার থিয়েটার কোম্পানি ‘থিয়েটার অব থার্টিন রোজ’-এ প্রথম প্রযোজনা (কোর্ডিয়ান) নির্মাণের অব্যবহিত পরেই এতে ‘অভিনয়ের পদ্ধতিগত গবেষণা’-র সূচনা করেন এবং দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ল্যাবরেটরি থিয়েটার’ শব্দবন্ধটি যুক্ত করেন। পরবর্তীতে গ্রোটওস্কি বারবার তার প্রয়াসকে ‘ল্যাবরেটরি থিয়েটার’ (গবেষণাগার নাট্য) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

স্বনামখ্যাত নাট্যনির্দেশক পিটার ব্র্রুক (১৯২৫- )-এর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য এম্পটি স্পেস’-এর চারটি অধ্যায়েই (দ্য ডেডলি থিয়েটার, দ্য হলি থিয়েটার, দ্য রাফ থিয়েটার, দ্য ইমিডিয়েট থিয়েটার) তার নাট্যবিষয়ক নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনার সমান্তরালে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিস্তৃত বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। অতএব প্রমাণিত হয় যে, পিটার ব্র্রুকও তার নাট্যনির্মাণ করেছেন গবেষণাগারের আশ্রয়ে বা গবেষণাগার নাট্যরীতিতে।

মার্কস প্রভাবিত জার্মান নাট্যকার ব্রেটোল্ড ব্রেশট (১৮৯৮-১৯৫৬) কর্তৃক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে দীর্ঘসংগ্রামের সহযোগী ও অর্ধাঙ্গিণী হেলেনা ভাইগেলের সঙ্গে স্থাপিত নাট্যসংগঠন ‘বার্লিনার আনসম্বল’-এ গবেষণাগার পদ্ধতিতে দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমেই নির্মাণ করেছিলেন ব্যাপক আলোচিত নাট্যাঙ্গিক ‘এপিক থিয়েটার’। যেখানে প্রাচ্যরীতির ‘বিযুক্তিকরণ’ বা ‘এলিয়েনেশন’ তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার প্রভৃতি মঞ্চকেন্দ্রিক গবেষণার মাধ্যমে নবতর ও কার্যকর এ দ্বান্দ্বিক থিয়েটার অবয়ব বিকশিত হয়।

বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) নাট্যপ্রযোজনা বা নাট্যনির্দেশনাকে যদিও প্রচলিত অর্থে গবেষণাগারসম্ভূত বলা কঠিন, কিন্তু এ আধুনিক ও আপাদমস্তক নাট্যমহাজনের প্রশিক্ষণপ্রদান, মহড়াপদ্ধতি, নাট্যভাবনা এবং সে ভাবনার সমান্তরালে নাট্যের আঙ্গিকসৃজন প্রভৃতি বিচারপূর্বক সেলিম আল দীন প্রমুখ বিশেষজ্ঞরা রবীন্দ্রনাথের নাট্যপ্রয়াসকে ‘শিথিল অর্থে’ গবেষণাগার থিয়েটার বলে অভিধান্বিত করার পক্ষপাতী। বিশেষত, রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক জোড়াসাঁকো পর্বের পরবর্তী প্রয়াস অর্থাৎ তার ‘শান্তিনিকেতন পর্ব’-র নাট্যভাবনা ও প্রয়োগ নিশ্চিতই গবেষণাগার থিয়েটার নামে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্য।

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন ‘ল্যাবরেটরি থিয়েটার’-এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে ‘গবেষণাগার নাট্য’ অভিধাটি প্রথম ব্যবহার করেন, একথা পূর্বেই উক্ত হয়েছে। নাট্যাচার্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে জ্ঞাত যে, সেলিম আল দীন নাট্যনির্মাণকে বিজ্ঞানের সমতুল্য বলেই জ্ঞান করতেন। বিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণার ক্ষেত্রে যেমন ল্যাবরেটরিতে ‘পরীক্ষা-পর্যক্ষেক্ষণ’ ধাপের মধ্য দিয়ে একটি ‘সিদ্ধান্ত’ পর্যায়ে উপনীত হওয়া যৌক্তিক, তেমনি নাট্যগবেষণাগারে গবেষণাগার পদ্ধতিতে ব্যবহারিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে ‘চূড়ান্ত ফলাফল’ অর্জন এবং পরবর্তীতে তা মঞ্চে বাস্তব-প্রয়োগের মধ্য দিয়ে গবেষণাগার নাট্যরীতির সমগ্রবৃত্তটি পরিভ্রমণ করাও সম্ভব। এভাবেই সেলিম আল দীন লঘু-নৃগোষ্ঠী মারমাদের উপকথাভিত্তিক প্রযোজনা এথনিক থিয়েটার (জাতিগত থিয়েটার) ‘মনরিমাংৎসুমুই’ সহযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের নাট্যগবেষণাগারে গবেষণাগার পদ্ধতিতে নব্যসৃজন করেছিলেন নিও-এথনিক থিয়েটার (নব্য-জাতিগত নাট্য) ‘একটি মারমা রূপকথা’। আর এক্ষেত্রে তার শিল্পদর্শন, গবেষণাপদ্ধতি এবং গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত উপাত্ত ও সিদ্ধান্তসমূহের বাস্তবপ্রয়োগপ্রক্রিয়া প্রভৃতির বিস্তৃত বিবরণের প্রামাণ্য হয়ে রয়েছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত সেলিম আল দীন কৃত অসামান্য গ্রন্থ ‘গবেষণাগার নাট্য : একটি মারমা রূপকথা’।

Image may contain: 2 people, people on stage

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, গবেষণাগার নাট্যরীতির উদ্ভব ঘটে প্রচলিত ধারার সাপেক্ষে ভিন্নতর তত্ত্ব ও প্রয়োগরীতির ভাবনা থেকে। সুতরাং গবেষণাগার থিয়েটারের আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- নবতর শিল্পাদর্শ ও প্রয়োগরীতি এবং এ লক্ষ্যে তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক মঞ্চকেন্দ্রিক গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত উপাত্তসমূহ বিশ্লেষণ, বর্জন-গ্রহণ ও সর্বশেষ মঞ্চে উপস্থাপিত হওয়ার মধ্যেই গবেষণাগার থিয়েটারের সার্থকতা। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন গবেষণাগার থিয়েটার পদ্ধতিতে নাট্যসৃজন কার্যক্রমকে ‘গবেষণাগার নাট্য : একটি মারমা রূপকথা’ গ্রন্থে চারটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন-
ক. নির্দেশকের শিল্পতত্ত্বের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী তা বিচার করা।
খ. উল্লিখিত শিল্পতত্ত্বের ক্রমান্বয়সমূহের প্রয়োগগত চর্যা।
গ. নিরীক্ষাসমূহের পৌনঃপুনিক বর্জন, নির্বাচনের ফলাফল বিচার ও সংকলন।
ঘ. ফলাফলসমূহের বাস্তব প্রয়োগ।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের অংশ হিসেবে এবং নাট্যাচার্যের কর্মপ্রয়াসে উদ্বুদ্ধ হয়ে ও তার প্রেরণায় গবেষণাগার নাট্যপদ্ধতিতে নাট্যসংগঠন ফরিদপুর থিয়েটারের সঙ্গে আমি নির্মাণ করেছিলাম মৈমনসিংহ-গীতিকার পালা অবলম্বনে গবেষণাগার নাট্য কাজলরেখা। এখানে নির্দেশক হিসেবে আমার শিল্পাদর্শ ছিলো- উপনিবেশ উত্তরকালে ঐতিহ্যের ধারায় একটি আধুনিক নাট্যপ্রযোজনা নির্মাণ, যা একই সঙ্গে ঐতিহ্যের বিশিষ্টতাকে ধারণ করবে এবং পাশাপাশি হয়ে উঠবে আধুনিক দর্শকের রুচির সমান্তরাল। অর্থাৎ উপনিবেশ-উত্তর ও পাশ্চাত্য নাট্যরীতি প্রভাবিত এ সমকালে একটি প্রাচীন গীতিকা বা পালা কিংবা ঐতিহ্যবাহী নাট্য কীভাবে স্বীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ অক্ষুন্ন রেখেই আধুনিক দর্শক-শ্রোতাদের রুচির উপযোগী হয়ে উঠতে পারে গবেষণাগার পদ্ধতিতে তার ব্যবহারিক সূত্রসমূহ চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যের ধারায় বাঙালির নিজস্ব আধুনিক নাট্যরীতি বাঙলা নাট্যরীতির সাধারণ সূত্রসমূহ উদ্ভাবনই ছিলো আমার অভীষ্ট। পরবর্তীতে গবেষণাগার নাট্যরীতিতে ‘কাজলরেখা’ প্রযোজনা নির্মাণ, দর্শকের সম্মুখে প্রদর্শনীর মাধ্যমে সিদ্ধান্তসমূহের উপযোগিতা যাচাই এবং গবেষণাগার হতে প্রাপ্ত উপাত্তসমূহ তথা গবেষণার বিস্তৃত বিবরণ প্রভৃতি আমার রচনায় গ্রন্থাকারে ‘‘লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপনরীতি : ‘মৈমনসিংহ-গীতিকার ‘কাজলরেখা’’ নামে ১৯৯৭-এ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, পূর্বোল্লিখিত বিজ্ঞান-গবেষণার অনুরূপ বাঙলা নাট্যরীতির ‘পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্ত’ পদ্ধতির স্মারক নাট্যচার্য সেলিম আল দীনের গ্রন্থটির পরে এটিই ছিলো বাংলা ভাষায় এতদধারার দ্বিতীয় গ্রন্থ। উৎসাহীজন গবেষণাগার নাট্যরীতি সম্পর্কে অধিকতর ধারণা অর্জনের জন্য নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন প্রণীত ‘গবেষণাগার নাট্য : একটি মারমা রূপকথা’ এবং আমার ‘‘লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপনরীতি : ‘মৈমনসিংহ-গীতিকার ‘কাজলরেখা’’ গ্রন্থদ্বয় পাঠ করতে পারেন। পাশাপাশি পঠন আবশ্যক ইছামতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এবং অধ্যাপক রশীদ হারুন প্রণীত ‘সেলিম আল দীনের নাট্যনির্দেশনা : নন্দনভাষ্য ও শিল্পরীতি’ গ্রন্থটি।

Image may contain: 1 person, text

এ পর্যায়ে নাট্যসংগঠন স্বপ্নদলের প্রযোজনাসমূহকে কীভাবে গবেষণাগার নাট্যরীতিপ্রসূত বলে বিবেচনা করা সম্ভব তা বিশ্লেষণের প্রয়াস পাওয়া যেতে পারে। ২০০১-এর ১০ই আগস্ট প্রতিষ্ঠিত স্বপ্নদলের স্লোগান ‘ঐতিহ্য অন্বেষণে শৈল্পিক শুদ্ধতা’। অর্থাৎ স্বপ্নদল বিশ্বাস করে যে, উপনিবেশ-উত্তর এ শিল্পবিভ্রান্তির কালে বাঙালির দীর্ঘ ঐতিহ্য অন্বেষণের প্রক্রিয়ায়ই প্রকৃতপক্ষে বাঙালির নিজস্ব শুদ্ধশিল্পের সন্ধানলাভ সম্ভব। বর্ণিত বিশ্বাসের অনুকূলে নাট্যসংগঠন হিসেবে স্বপ্নদলের শিল্পদর্শন হচ্ছে উপনিবেশ-উত্তরকালে ঐতিহ্যের ধারায় বাঙালির নিজস্ব আধুনিক নাট্যরীতি ‘বাঙলা নাট্যরীতি’ নির্মাণ। আর ‘বাঙলা নাট্যরীতি’ নির্মাণপ্রয়াসেই স্বপ্নদল উপনিবেশের প্রভাবে ইতঃপূর্বে প্রায় বিবর্তনহীন ঐতিহ্যের নাট্যধারার উপস্থাপনরীতির সঙ্গে, এর স্বীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ বজায় রেখেই, বিশ্বনাট্যধারার নানা উপকরণ আত্মীকরণের মাধ্যমে আধুনিক দর্শকের রুচির উপযোগী নিজস্ব আধুনিক বাঙলা নাট্যরীতির প্রযোজনা নির্মাণকৃত্য অব্যাহত রেখেছে। অদ্যাবধি স্বপ্নদলের ১৭টি প্রযোজনার প্রায় সবকটিতেই এ দর্শনের ব্যবহারিকরূপ সৃজনের লক্ষ্যে গবেষণাগার নাট্যরীতিতে বর্ণিত চতুর্বিধ ধাপ অর্থাৎ মঞ্চকেন্দ্রিক নাট্যগবেষণার ধারাবাহিকতায় নির্দেশকের সুনির্দিষ্ট শিল্পতত্ত্বের আলোকে এর ক্রমান্বয়মূহের প্রয়োগগত চর্যা, নিরীক্ষাসমূহের ক্রমবর্জন-সংশোধন-বিচার-সংকলন এবং মঞ্চে এর ব্যবহারিক প্রয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, সুনির্দিষ্ট শিল্পতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্বের ক্রমসংশোধন, গবেষণাগারে ক্রমচর্যা, নিরন্তর সংযোজন-বিয়োজন, ভাঙা-গড়া, গ্রহণ-বর্জন এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক মঞ্চগবেষণা কৌশল ‘গবেষণাগার নাট্যরীতি’ অবলম্বনপূর্বক নির্মিত হয়েছে স্বপ্নদলের প্রযোজনাসমূহ।

Image may contain: 4 people, people sitting, people standing and child

প্রসঙ্গত, স্বপ্নদলের প্রথম প্রযোজনা ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাসমূহে (যেমন: ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘ডাকঘর’, ‘হরগজ’, ‘জাদুর প্রদীপ’, ‘স্পার্টাকাস’, ‘পদ্মগোখরো’, ‘হেলেন কেলার’ প্রভৃতি) এ গবেষণাগারপ্রসূত উপস্থাপন দর্শকের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। উপরন্তু, বর্ণিত নাট্যরীতিতে নির্মিত ‘ত্রিংশ শতাব্দী’, ‘হেলেন কেলার’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘স্পার্টাকাস’ প্রভৃতি প্রযোজনা দেশের পাশাপাশি দেশের বাইরে জাপান (ফেস্টিভ্যাল/টোকিও ২০১৮ এবং টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের আমন্ত্রণে ২০১৮), ইংল্যান্ড (এ সিজন অব বাঙলা ড্রামা ২০১৫) এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় নট্যোৎসব ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি)-র ‘ভারত রঙ মহোৎসব ২০১৫’সহ ভারতের নানা উৎসবে আমন্ত্রিত প্রদর্শনী মঞ্চায়ন ও দর্শকের গ্রহণযোগ্যতার মধ্য দিয়ে বহির্বিশ্বেও এসব গবেষণার সাফল্য প্রমাণিত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, আধুনিককালে ব্যক্তির যেমন তেমনি একটি নাট্যসংগঠনেরও সুনির্দিষ্ট দর্শন থাকা বাঞ্ছনীয়। সে বিচারে সুনির্দিষ্ট শিল্পতত্ত্বের অধিকারী এবং উপনিবেশ-উত্তরকালে বাঙালির নিজস্ব নাট্যাঙ্গিক ‘বাঙলা নাট্যরীতি’ বিনির্মাণে ব্রতী নাট্যসংগঠন স্বপ্নদল বাঙলা তথা বিশ্বনাট্যধারার গর্বিত উত্তরাধিকার হিসেবে দলের আগামীর পথচলায়ও গবেষণাগার নাট্যরীতিতে নাট্যসৃজনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার বিনীত অথচ দীপ্তপ্রত্যয় ঘোষণা করে।

জাহিদ রিপন: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক, স্বপ্নদল
ই-মেইল: zahidrepon@gmail.com