Categories
গল্প সাহিত্য

ছোটগল্প – বড় সাধ


— কাজী চপল
রইস বিষন্ন। আকাশটাও যেন তাই। মৃদুমন্দ হাওয়ায় ঝরঝর ঝরছেই। আকাশের রঙটা বেশ ঘোলা। ঘোলাটে আকাশটা দেখে কেমন যেন ঘোর লেগে যায় তার। ভয় হয়। শহরের গলি ঘেষা যে সব বাড়ী সে গুলো যেন খানিকটা নড়েচড়ে হা করে চেয়ে আছে আকাশে। আজ জুঁইকে খুব দরকার ছিল, জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে পিষে ফেলার অভিপ্রায় ছিল।
আকাশের সাথে সাথে বাড়ীগুলো আর সবুজগাছেরা ঘোলাটে হয়ে উঠছে। সেকি!! বাড়ীগুলো উড়ছে যেন। রাস্তাটা এবার এঁকেবেঁকে দুর আকাশে ছুটছে। কেন যে আজ নিখিল ব্যানার্জীর মালকোষটা শুনতে গেল।
জুঁই আমাকে ধর, রইস চোখ বড় বড় করে উথাল পাথাল দুনিয়াটা দেখে।
রাস্তায় উঠে হাঁটা দেয় যেন উঠে গেল আকাশে। দারুণ পথ চলা, পদে পদে উছলে পড়ে যাবার আনন্দ। নিজেকে সামলে নেয় সে। মেঘের কাছকাছি পৌঁছে গেছে রইস।ফাকফোকর গলে সূর্যটা উকি দিয়ে যায়। এমন বেগুনী সূর্য রইসকে জারুল ফুলের মতন রাঙিয়ে দিয়ে গেল।
চারদিকে কোটি কোটি জারুল ফুল, অলৌকিক বেগুনী রঙটা রাস্তাাটাকেও রাঙাল। আকাশ আর ধুসর নেই, অলৌকিক বেগুনী তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
রাস্তাটা এবার নামছে নতুন ভঙ্গীতে তালেতালে হেলেদুলে।
অলৌকিক বেগুনীর চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে দাড়াল এক খুরধার চক্রে। কি অপরুপ আর মোহনীয় ধারাল সে চক্র।
রইস এখন একটা প্রকান্ড বেগুনী রঙের ব্লেন্ডারের মধ্যে।
শব্দ করে চালু হয়ে গেল ব্লেন্ডারটা। ঘুরছে সে খুরধার চক্র।
রক্ত মাংস হাড় ধীরে ধীরে হয়ে গেল তরল। লাল শরবতের মতন।
আহা মনমুগ্ধকর সে রঙ। বেগুনীটা আর কোথাও নেই। এখন সব লাল।
ব্লেন্ডারটা নিয়ে ছুটছে কেউ লম্বা লম্বা পা ফেলে।
কলাতিয়ার পাশে পশ্চিম ঢালিকান্দির ধলেশ্বরী নদীতে ঝপাস করে পড়ে গেল তরল রইস। তার সকল অস্তিত্ব জুড়ে কেবল ধলেশ্বরী। নদীর জলে মিলে মিশে একাকার তার অস্তিত্ব।
প্রবহমান ঢেউয়ের দোলে নাচছে যেন রইস। উর্মিমালায় নেচে নেচে ভাটির দেশে চলল রইস।
মাছেরা রইসকে নিজের রক্তমাংসে বড় করে চলে। মাছের পেটে রইসের অস্তিত্ব নতুন করে রুপান্তরিত হয়। নদীও মোহনা ছাড়িয়ে নীল গভীর জলরাশির মধ্যে হারিয়ে যায়।
বিশাল বিশাল মাছেদের পেটে বেড়ে চলে রইস। রইসের অস্তিত্ব এখন আবার রক্ত মাংসে বড় হতে থাকে।
বাঘাড় মাছটা বড্ড ছটফট করছে, রইসের অনুভব কুতুবদীয়ার পান খাওয়া বুড়ো জেলে
হোসেন মিঞার জালে আটকা পড়েছে তার অস্তিত্ব। পঞ্চাশ হাজারে বিক্রি হয়ে গেল মস্ত বাঘাড়টা।
হীম শীতল হয়ে ঝাক্কি খেতে খেতে বাঘাড়টা এখন গুলশান সুপার মার্কেটের ধারাল বটির সামনে। খন্ড খন্ড হয়ে গেল রইস, রইসের অনুভব।
গরম তেলে উল্টে পাল্টে ডুবে ডুবে তৈরী হচ্ছে সে তার সে অস্তিত্ব¡। কড়া মরিচের জ্বলনে গরমে, হরেক মশলায় জারিত হয়ে সে এখন উপাদেয় অস্তিত্ব ।
হেলে দুলে চলেছে একটা সাদা প্লেটে করে, আরেকবার দারুণ মৃদু শব্দ করে রেস্টেুরেন্টের খাবার টেবিলে আছড়ে পড়ল যেন।
জুঁই, সেকি জুঁই। সে যে তার জুঁইয়ের সামনে। একটা ফর্ক নিয়ে রইসের অস্তিত্বকে গেঁথে নিল জুঁই।
সে এখন জুঁইয়ের কন্ঠ বেয়ে নামছে, এইতো ওর বুকের পাশ দিয়ে যাচ্ছে এইতো। স্যালিভারির সাথে মিশে সে এক মিউকাস, হাইড্রোক্লোরিক এসিড আর পেপিসিন তারে নিয়ে যেন খেলা করছে। পেরেস্টোলেসিস হয়ে শোষীত হল অন্ত্রে। ক্ষুদ্রান্ত্র হয়ে এবার সে রক্ত কনিকায়।
সেকি! তার অস্তিত্ব এখন জুঁয়ের ধমনীতে!
ধমনী হয়ে জুঁইয়ের হৃদপিন্ডে ঢুকে পড়ল রইস।
ধক ধক শব্দে হৃদপিন্ডের মাঝে ঘুরপাক খেয়ে চলে রইস, রইসের রক্তিম অস্তিত্ব।
হৃদপিন্ডের প্রতিটি শব্দে তার বড় সাধ হয় জুঁইকে বলবে ভালবাসি।
যেন ধকধক শব্দ না হয়ে তা হয়ে ওঠে ভালবাসি ভালবাসি।
কত কাছে সে এখন, একবারে হৃদপিন্ডের মধ্যে।
বড় সাধইতো হবার কথা।
ভালবাসি কি বলবে সে!!!!!